মঙ্গলবার ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

আপ্যায়ন

কুন্তল চৌধুরী   |   মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২০

আপ্যায়ন

একবার চিটাগাং থেকে ফিরছি । যাব দর্শনায় । তখন দূরপাল্লার বাসের প্রচলন ছিল না বললেই চলে । লোকাল বাসের চলাচল ছিল । বলছি আশির দশকের গোড়ার কথা । সেই সময় বিশ টাকায় হোটেলে ভালো ভাবে মাছ ভাত জুটে যেত । আরিচা থেকে লঞ্চে দৌলতদিয়া ঘাটে নেমে গোয়ালন্দ আসতে হতো ভ্যান রিকশায় অথবা হেঁটে । আগে গোয়ালন্দ ঘাটেই ভিড়ত লঞ্চ । নদী শুকিয়ে যাবার ফলে বিস্তির্ণ চরের বুকে আর নতুন করে ট্রেন লাইন পাতা হলো না । ফলে দৌলতদিয়ায় নেমে গোয়ালন্দ থেকেই ট্রেন চেপে ফিরতে হতো দর্শনায় ।

গোয়ালন্দ যখন পৌঁছালাম তখনো খুলনা থেকে ট্রেন এসে পৌঁছায়নি । হাতে বিস্তর সময় । লাইনের পাশে সারি সারি হোটেল । জড়াজির্ণই বলা চলে । একসময় এখানে প্রাণ ছিল । যখন ঘাট ছিল ষ্টেশন লাগোয়া । তখন লোকজনের আনাগোনায় ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো ।

মোটামুটি ছিমছাম পরিষ্কার দেখে এক হোটেলে ঢুকলাম একটু জিরিয়ে নেব বলে । চাটাইয়ের বেড়া টিনের ছাউনি গোবর ল্যাপা মেঝে । ঢুকতেই খালি গায়ে গামছা কাঁধে নাদুসনুদুস ভুড়ি দুলিয়ে এক বয়স্ক লোক এগিয়ে এলেন । আমায় বললেন ঘাড়ের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে একটু শান্ত হয়ে বসো বাবা । ট্রেন আসতে ঢের দেরি । আমি তার আন্তরিকতায় বেশ মুগ্ধ হলাম । কি সুন্দর গুছিয়ে কত সহজেই আপন করে নিলেন । আমাকে বললেন ঐ যে টিউবয়েল দেখছ ওখানে সাবানও রাখা আছে । ভালোভাবে হাত মুখ ধুয়ে এসো । আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার আদেশ পালন করতে লাগলাম । এসে দেখি টেবিলে চারটা গুড়ের বাতাসা আর এক গ্লাস জল রেখে উনি বসে আছেন । আমি আসতেই বললেন এটা খেয়ে নাও শরীর ঠান্ডা থাকবে । আজ রোদের তেজটা বড্ড বেশি । সত্যিই গুড়ের বাতাসা আর জল খেয়ে মনে হলো আহা এমন ভালো মানুষের মতো আমার বাবা যদি হতেন তাহলে এই বয়সে কাজের জন্য ছুটে বেড়াতে হতো না ।

তা খোকা কোথায় যাবে , বাড়ি কোথায় ? বললাম দর্শনায় আমার বাড়ি , ওখানেই যাব । দর্শনা !! জানো দর্শনা আমার খুবই চেনা । বহুবার গেছি । আচ্ছা ভাত খেতে খেতে গল্প করা যাবে । এতোদিন বাদে একজন ঘরের ছেলেকে কাছে পেলাম । বলে ভেতরে চলে গেলেন । খাওয়ার ইচ্ছে যে ছিলনা তা না । কিন্তু পকেটের যা অবস্থা তাতে হোটেলে বসে খাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে বার করে দিয়েছি । ভেবেছিলাম ট্রেনে দু এক টাকার বাদাম কিনে চিবুতে চিবুতে দর্শনা চলে যেতে পারব । তাতে ক্ষিদেও মিটবে পয়সাও বাঁচবে ।

ভাবছি কি করে তাকে না বলা যায় । এর মধ্যেই দেখি ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের প্লেট নিয়ে তিনি হাজির । সাথে লেবু কাঁচা লংকা আর ইলিশ মাছের পেল্লাই সাইজের একটা ভাজা । আমার জিহ্বা লক লক করার বদলে শুকিয়ে চৌচির । গলা থেকে হাজার চেষ্টা করেও শব্দ বের করতে পারছিনা । যতবারই বলতে যাচ্ছি আমার কাছে অতো টাকা নেই ততবারই গলা থেকে কুঁই কুঁই করে একটা বিচিত্র আওয়াজ বেরিয়ে আসে । পাশে বসে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলে চলেছেন জানো দর্শনার সব মানুষ একসময় আমার এখানে দুটো ভাত না খেয়ে যেতেন না । কি দিন ছিল তখন । নদীর থেকে স্টিমারের সাইরেন বেজে উঠত । শয়ে শয়ে লোক নামছে উঠছে । আর এখন শ্মশানের মতো হয়ে আছে সব । তা খোকা দর্শনার সুকুমার চৌধুরী কে চেনো ? ভীষণ বড়ো মনের মানুষ । তার বাসাতেও গেছি খেয়েছি । দুই ভাইয়ের সংসার এক সাথে । দেখে মনটা ভরে গিয়েছিল । যৌথ পরিবারতো এখন আর দেখাই যায় না ।

বললাম সুকুমার চৌধূরী আমার জেঠামশায় । আর তার যে ভাইয়ের কথা বলছিলেন তিনি হলেন অনুকুল চৌধূরী , আমার বাবা । শুনে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠলেন তাইতো বলি তোমাকে এতো চেনা চেনা লাগছে কেন । আমার অন্তরাত্মা তাহলে ঠিকই চিনেছে । তুমি দেখছি আমাদের ঘরেরই ছেলে । উনি ব্যস্ত হয়ে উঠে গেলেন । আমি কিছুটা সাহস পেয়ে খাওয়া শুরু করলাম । মাছটা মনে হচ্ছে মাখনের মতো নরম আর সুস্বাদু । এতো বড়ো ইলিশের টুকরো এই প্রথম ।

একি করছেন ইলিশের এতো বড়ো ডিম ভাজা আমি কখনো খাইনি ! তাও আবার দুইটা !! সাথে আবার পেল্লাই সাইজের ইলিশ ভাঁপা । আমার কথা শুনে ধমকে বললেন যা দিচ্ছি চুপ করে খেয়ে উঠবে । কোনো কথা বলবে না । বাসায় তো তোমার মাকে দেখেছি মাছের ডিমকে টুকরো করে কেটে সবাইকে সেই ভাজা পাতে দিতে । আমি তোমার কাকা । সবই তো আমার জানা বাপু । বাবাকে গিয়ে বলবে ফণী কাকার হোটেলে খেয়ে এসেছ । দেখবে কতোটা খুশি হন তিনি ।

যাক বাবা , কাকা যখন খাওয়াচ্ছে তখন আর চিন্তা নেই । এখন খাওয়াটার স্বাদ দশগুণ বেড়ে গেল আমার কাছে । এটা আমার প্রায়ই হয় । যেমন ধরুন মিষ্টি খাওয়ার খুব সখ হলো । মিষ্টির দোকানে পয়সা খরচ করে মিষ্টি খেলাম কিন্তু কোনো স্বাদ পাইনা । বিস্বাদে ভরা । আবার সেই মিষ্টি যদি অন্য কেউ খাওয়ায় তখন কোত্থেকে যে রাজ্যের স্বাদ এসে জড়ো হয় বুঝতে পারিনা । এসব আমি রাখ ঢাক না করেই স্বীকার করি । এতে আমাকে কৃপণ ভাবলে কিছুই বলার নেই । তবে ইলিশ মাছের গোটা ডিমের ভাজাটা কিন্তু জব্বর ছিল । জীবনে ওটাই প্রথম ওটাই শেষ । বহুবার ভেবেছি ইলিশের একটা গোটা ডিম ভাজা নিয়ে অনন্তকাল ধরে রসিয়ে রসিয়ে খাব । কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি ।

ট্রেন এসে গেছে । উনিও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নতুন কাস্টমার ধরার জন্য । হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে বসতেই দেখি দর্শনা যাবার ট্রেনের টিকিট আমাকে ধরিয়ে দিলেন । হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি আবার এসব করতে গেলেন কেন ? উনি কোনো কথা না বলে শার্টের পকেটে টিকিট টা ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন তুমি আমার ঘরের ছেলে । এতোটুকু যদি না করি তোমার বাবা জেঠার কাছে মুখ দেখাব কি করে ? আমি তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম । তিনি আশীর্বাদ করে বললেন তোমার কাছে বিলের কথা বলাটা অন্যায় । তা বাবা এটা তো ব্যবসা । দান খয়রাত তো করতে পারিনা । কথায় আছে বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী । বাসায় তোমাকে নিয়ে যেতে পারলে তোমার কাকিমা খুবই খুশি হতেন । তোমার ঘরে ফেরা তাড়া , নইলে তোমাকে ছাড়তাম না । হাজার হলেও তুমি তো আমাদের ঘরেরই ছেলে । তোমার টিকিট নিয়ে সর্বমোট হয়েছে পঁচানব্বই টাকা । শুনেই চোখে সর্ষে ফুল দেখতে শুরু করলাম । কান দিয়ে গরম সর্ষে ভাঁপার ধোঁয়া বের হতে লাগল ।

আমার সকল শ্রদ্ধা ভক্তি নিমেষে উধাও হয়ে গেল । মুখের ভেতরটা মনে হচ্ছে তিতায় ভরে যাচ্ছে । কেবলই দলা পাকিয়ে থুতু বের হতে চাইছে । সম্বল মাত্র একশ টাকার নোটটা উনার হাতে তুলে দিলাম । উনি পাঁচ টাকা ফেরত দিয়ে বললেন , অনেক বড়ো হও বাবা । তোমাদের আদবকায়দাই আলাদা । হাজার হোলেও চৌধূরী বংশের ছেলে তুমি । সহবত ভদ্রতা তোমাদের রক্তে মিশে আছে ।

আমি আজও তার আপ্যায়নের তারিফ না করে পারিনা । টাকার কথা ভাবি না । না চাইলেও কতো ভাবেই তো বাজে খরচ হয়ে যায় । কিন্তু এমন আপ্যায়ন টাকা দিয়েও কেনা যায় না । সত্যিই বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী । কে বলে বাঙ্গালী ব্যবসা জানেনা । এমন মধুর আপ্যায়ন বাঙ্গালী ছাড়া ভূ-ভারতে আর কোত্থাও কেউ করবে না , লিখে দিলাম ।

Facebook Comments
advertisement

Posted ২:৪১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
প্রধান প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com