বৃহস্পতিবার ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

আশীর্বাদ

কুন্তল চৌধুরী   |   রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২০

আশীর্বাদ

আমার এক আত্মীয় তার সদ্যজাত ফুটফুটে সন্তানের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে লিখলেন – সকলের কাছে আমার এই সন্তানের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনীয় । আমি কমেন্টে লিখলাম – কট্টর মৌলবাদী হয়ে গড়ে ওঠো , অমানুষের মতো অমানুষ হও , লুটেরা ধর্ষক হয়ে জাতির মুখ উজ্জ্বল করো । বলাবাহুল্য সেই আত্মীয় আমাকে ব্লক করলেন । সত্যযুগে মানুষ রেগে গেলে অভিশাপ দিত । এখন আর মানুষ অভিশাপ দেয় না । কারণ যতই অভিশাপ দেয় ততই তার উন্নতি তর তর করে হতেই থাকে । তাই কলিযুগে মানুষ রেগে গেলে ব্লক করে দেয় তার ফেসবুক আইডি থেকে ।

যথারীতি আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে এই নিয়ে তীব্র শোরগোল পড়ে গেল । সবাই একে একে তীব্র ভৎর্সনা করতে লাগলেন কখনো ফেসবুকে কখনো ফেস টু ফেস । এক সন্ধ্যায় পাড়ার ক্লাব থেকে চিঠি এলো আগামী রবিবার সন্ধ্যে সাতটায় আমায় হাজির থাকতে হবে ক্লাবে । কারণ অসামাজিক মন্তব্যে আমি সমাজকে কলুষিত করতে চেয়েছি । হেন কাজের জন্য সামাজিক বিচারের আয়োজন করা না হলে সমাজ ক্রমশই অন্ধকারময় হয়ে পড়বে । আমায় নিরুত্তাপ দেখে বাড়ির লোকজন উত্তপ্ত হয়ে উঠল । বৌ মুখ ঝামটা দিয়ে বলল কেন এসব লিখতে গেলে , তোমার কী কাউকে ভালো কিছু লিখতে গায়ে ফস্কা পড়ে ? আর এভাবে কী কেউ কাউকে আশীর্বাদ করে ? তোমার সন্তানের বেলায় কেউ অমন লিখলে তুমি কী করতে ? আমি কথা বলি না । কারণ কথায় কথা বাড়ে । আমার আওয়াজ না পাওয়ায় তার মেজাজ সপ্তমে উঠতে থাকে । দেখো কেমন ঘাপটি মেরে রয়েছে । মনে হচ্ছে কিস্যুটি জানেনা । এখন দেখব তোমার পান্ডিত্য তোমাকে কেমন করে বাঁচায় ।

আজ রবিবার । সারা বাড়ি থমথমে । কেউ কোনো কথা বলছে না আমার সাথে । আমি আমার লেখাতেই ডুবে রইলাম । শুধু আমার মেয়েটা কাছে এসে বলল আচ্ছা বাবা আজ নাকি তোর বিচার হবে ? আমি বললাম হ্যাঁ গো মা আজ আমার বিচার হবে । সে আবার বলল তোর ভয় করছে না ? আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম একটুও না । আমি তো অন্যায় কিছু করিনি যে ভয় পাব । তাহলে ওরা তোর বিচার করবে বলছে কেন ? আমি বললাম মাগো ওদের কাছে মনে হয়েছে আমি অন্যায় করেছি । আজ কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায় তারই বিচার হবে । সে সাথে সাথে আমার গালে চুমু দিয়ে বলল আমিও যাব তোর সাথে । আমি বললাম তাহলে তো মা আমার আর কোনো ভাবনাই নাই । তুমি সাথে থাকলে কারোরই সাহস নেই আমাকে বকা দেয় ।

webnewsdesign.com

পোনে সাতটায় চলে গেলাম ক্লাবে । এটা আমার এক চিরাচরিত অভ্যেস সময়ের আগে পৌঁছে যাওয়া । কেয়ারটেকার বলল এতো তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে ? সকলের আসতে এখনো অনেক দেরি । এতোক্ষণ এখানে একা না থেকে বাসায় চলে যান । সবাই এলে পরে আপনাকে ফোন করে জানাব । আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম এসেছি যখন , তখন একেবারে মিটিং শেষ করেই যাব । বরং দুটো চেয়ার দাও । বাপ বেটিতে মিলে মনের সুখে একটু কথা বলি ।

সোয়া সাতটার দিকে ধীরে ধীরে সবাই আসা শুরু করল । ক্লাবঘরের হলরুম ভরে যেতে লাগল একটু একটু করে । আমার অভিযোগকারী আত্মীয়েরা যারা আমাকে শত্রু মনে করেন তারাও জড়ো হলেন । আমার থেকে বেশ খানিকটা দূরেই বসলেন । যেন ছোঁয়া না লাগে । ক্লাবের সেক্রেটারি প্রথম মুখ খুললেন । আমাকে বললেন আপনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ । আপনি তার সন্তান কে আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ দিয়েছেন । আমি সেক্রেটারিকে বললাম আমি যে অভিশাপ দিয়েছি তার কোনো প্রমাণ আপনার কাছে আছে ? উনি বললেন না তা নেই । আপনার সেই কমেন্টস তো উনি ডিলিট করে দিয়েছেন পোস্টের সৌন্দর্য্যতা বজায় রাখতে । আমি বললাম প্রমাণ যখন নেই আমি অস্বীকার করতেই পারি । কিন্তু তা আমি করব না । কারণ আমার মেয়ে দেখুক তার বাবা সত্য স্বীকারে ভয় পায় না । তবে আমি তাকে অভিশাপ দেইনি বরং আশীর্বাদই করেছি । আমার আশীর্বাদ আপনাদের সকলের কাছে অভিশাপ মনে হতে পারে ।

আমার সেই আত্মীয় ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন দু’দিনের যোগী ভাতকে বলে অন্ন । হালে একটু লেখালেখি শুরু করেছে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করছে । তাও যদি পেপার টেপারে ছাপা হতো তাহলেও নয় বুঝতাম । লেখে তো ঐ ফেসবুকে । আর লেখার কী ছিরি ? পাতেই দেয়া যায় না ছিঃ । তাতেই বাবুর দেমাক কত ? আমি হা হা করে হেসে ফেললাম তার কথায় । আমার হাসিতে সবাই অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন । সেক্রেটারি আমার সেই আত্মীয়কে বললেন ব্যক্তিগত কুৎসা শোনার জন্য আমরা এখানে বসিনি । আমাকে বললেন আপনার বিরুদ্ধে যা অভিযোগ আপনি তাহলে তা স্বীকার করে নিচ্ছেন ? আমি বললাম অভিযোগ অস্বীকার করছি কিন্তু লেখাটা সত্যি । আবারো বলছি সেটি ছিল আশীর্বাদ , অভিশাপ নয় । উনি বুঝতে ভুল করেছেন । সেক্রেটারি বললেন এটা কী ধরনের আশীর্বাদ বুঝিয়ে বলবেন কি ? এমন অভিনব আশীর্বাদ জীবনে প্রথম শুনলাম । এরপর থেকে না হয় আপনার আশীর্বাদকেই আমরা অনুসরণ করব ।

আমি বললাম আমার বক্তব্যটা দীর্ঘ হবে যদি আপনারা তার ব্যখ্যা চান । অবশ্যি তার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না । কমন্টসে লিখেছিলাম কট্টর মৌলবাদী হও , লুটেরা হও , ধর্ষক হয়ে জাতির মুখ উজ্জ্বল করো । আচ্ছা আমরা তো প্রতিটা শিশুকেই আশীর্বাদ করে বলি মানুষের মতো মানুষ হও । কিন্তু আমরা কি সেই ভাবে শিশুকে বড়ো করে তুলি ? নিশ্চয়ই না । যদি করতাম তাহলে তাকে স্বার্থপর হতে শেখাতাম না । কখনো তাকে বলতাম না স্কুলে তোমার টিফিন অন্য কারোর সাথে শেয়ার করবে না । কখনো বলতাম না রাস্তায় কোনো ঝুটঝামেলা দেখলে তাতে নিজেকে জড়াবে না । নিজে বাঁচলে বাপের নাম । বড়ো হতে হলে স্বার্থপর হতে হবে । বাড়ি এবং স্কুলের টিচার ম্যাম ছাড়া কোনো বন্ধুত্ব পাতাবে না । কিন্তু দেখেন সবাই আশীর্বাদ করেছিল সে যেন মানুষ হয় । অথচ তাকে তৈরি করছি অমানুষের আদলে । মানুষের থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছি সেই শৈশব থেকেই ।

প্রতিদিন একটা শিশু সন্তান বড়ো হয়ে ওঠে ঘরে বাইরে রাস্তাঘাটের আনাচে কানাচে মাইকে মোবাইলে ওয়াজ মাহফিলের নামে মেয়েদের নিয়ে নানা বাজে মন্তব্য শুনতে শুনতে । মেয়েদের কখনো খোলা মিষ্টি কখনো তেতুল বলে নানা খাদ্যের সাথে তুলনা করা হয় । মেয়েরা পুরুষের ভোগের সামগ্রী । তাদের জন্ম হয়েছে শুধু পুরুষকে আনন্দ দেবার জন্য ।

আমরা কেউকি তাদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো প্রতিবাদ করেছি না রুখে দাঁড়িয়েছি ? বরং তা না করে আমাদের মেয়েদেরকেই আপাদমস্তক ঢেকে রেখে ঐসব ফতোয়াবাজদেরকেই পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিয়ে গেছি । যে মনু সংহিতাকে হিন্দুরা তাদের জীবন চলার ক্ষেত্রে একমাত্র মানদন্ড মনে করেন সেই মনু সংহিতায় মেয়েদেরকে পদে পদে যেভাবে অপদস্থ করা হয়েছে তা পড়লে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায় ।

সেখানে ঋষি মনু বলছেন – শাস্ত্র মতে স্ত্রী জাতি হলো মিথ্যা অর্থাৎ অপদার্থ ,৯/১৮ । মূর্খ হোক আর বিদ্বানই হোক কাম ক্রোধে বশীভুত পুরুষদের বিপথে নিয়ে যেতে কামিনীরা সমর্থ হয় , ২/২১৪ ।আরও যদি প্রমাণ চান সবিস্তারে সেই প্রমাণ দিতে পারব । অথচ তারাই আবার বলে মায়ের পায়ের নীচে স্বর্গ ।

এ কেমন দ্বিচারিতা ? তো সেই শিশু বড়ো হলে ধর্ষক হবে না তো কী হবে বলতে পারেন ? আমরা কি এই শিশু সন্তানকে একজন ধর্ষক করে গড়ে তুলছি না ? এখানে উপস্থিত এক সদস্যকে একদিন বলেছিলাম তোমার ছেলের জন্য তো সন্ধ্যের পরে অলিগলিতে ঢোকাই দায় । একটুতো শাসন করতে পারো । তার বেলাল্লাপনায় তো আমাদেরই মানসম্মান যায় । শুনে সে হাসতে হাসতে বলেছিল আরে এই বয়সে একটু আধটু সবাই শান দেয় । আমি স্তম্ভিত হয়েছিলাম তার মন্তব্যে । আমার এই মেয়েটাকে কোথায় রেখে যাচ্ছি বলতে পারেন ?

প্রতিদিন একটা শিশুকে শোনানো হয় তার ধর্মই শ্রেষ্ঠ । বাকি সব ধর্মালম্বীরা নিকৃষ্ট । তারা কখনো স্বর্গে বা বেহেস্তে যেতে পারবে না । তাদের হত্যা করা তাদের উপাসনালয় ভেঙে ফেলা ধর্মের কাজ । আমরা কি কখনো তার প্রতিবাদ করে বলেছি মানবতাই একটা মানুষের প্রধান ধর্ম ? প্রতিবাদ করিনা কারণ আমিও সেই মতে বিশ্বাসী এবং সেই কারণেই আমার শিশুকে আমি মানুষ না গড়ে গড়ছি কট্টর মৌলবাদী করে । তার এই শিশু মনে ধর্মের বিষ ছড়িয়ে দিয়ে তাকে কি অমানুষ করে গড়ে তুলছি না ? এই যে এখন একদিকে নারায়ে তকবির অপরদিকে জয় শ্রী রাম বলে একে অপরের দিকে খোলা তরবারি উঁচিয়ে রণ হুংকারে ছুটে যাচ্ছে তার জন্য কি আমরা প্রত্যেকে দায়ী নই ? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কেউ ?

আধুনিকতার নামে সন্তানের সিগারেটের প্যাকেট বাবা হয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছি । মদের টাকা নেশার টাকা প্রতিদিন যুগিয়ে যাচ্ছি । ফেস্টিবেলে ছেলে মেয়ে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে বসে এক সাথে মদ গিলছি । এটাই কি আমাদের কৃষ্টি আমাদের সভ্যতা ? আমার বাসার সামনের দোকানদার যে সব ছেলে মেয়েদের জন্মাতে দেখেছে আজ তাদেরকেই সে সিগারেট বিক্রি করছে অবলীলায় ।

আজ তারাই প্রকাশ্যে আমার আপনাদের সামনে ধোঁয়া উড়িয়ে বেড়ায় । এই নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য কি আমরা দায়ী নই ? প্রতিনিয়ত আমরাই নিজের ভাষা নিজের পরিবার নিজের সমাজ জাতি নিজের শিক্ষা দীক্ষা কর্ম এবং ধর্মের সাথে প্রতারণা করে ধর্ষণ করে চলেছি স্বজ্ঞানে বীরদর্পে । লুট করছি নির্লজ্জভাবে ।

একজন শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর আগে সেই ছাত্রের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস দেখেন । তাদের দামি গাড়ি আছে কি না , মাসিক উপার্জন কত । এই যদি হয় ছাত্রকে জ্ঞান দানের শিক্ষকের মানদন্ড তাহলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত কোথায় ? একবারও কি ভেবে দেখেছি এর পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে ?

যদি আশীর্বাদ করলে অভিশাপের মতোই ফল পাওয়া যায় তাহলে সেই আশীর্বাদ না করে অভিশাপ দেয়াটাই উত্তম । তাতে যদি অন্তত একটা শিশু প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে । এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর জন্য মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে চিৎকার করে বলতে পারে আলো দাও ।

সারা হলঘর পিনপতন নীরবতা । সবাই মাথা নীচু করে বসে আছেন । নীরবতা ভেঙে বয়োজ্যেষ্ঠ প্রবীণ সভাপতি এসে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন আমাদের দেয়া শিক্ষা যে এখনো শেষ হয়ে যায়নি আজ তুমিই তা প্রমাণ করে দিলে বাবা । তোমার এই বক্তব্যে যদি এক জনেরও হুঁশ ফেরে তাহলে আমাদের সকলের জন্যই মঙ্গল । আজ বহুদিন পর বুকের ওপরে বসা থাকা অভিশপ্ত একটা পাথর কিছুটা হলেও আলগা হলো ।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ২:১৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

কবিতা- মৃত্যু
কবিতা- মৃত্যু

(527 বার পঠিত)

আপ্যায়ন
আপ্যায়ন

(484 বার পঠিত)

এই ফাল্গুনে
এই ফাল্গুনে

(337 বার পঠিত)

দাগ
দাগ

(217 বার পঠিত)

আহব্বান
আহব্বান

(181 বার পঠিত)

অন্ত্যমিল
অন্ত্যমিল

(177 বার পঠিত)

কবিতা হতে চাই
কবিতা হতে চাই

(37 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com