শুক্রবার ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

করোনার মধ্য দিয়ে তেরখাদা একটি মডেল ও মানবিক উপজেলায় উন্নীত হবে

  |   বুধবার, ২০ মে ২০২০

করোনার মধ্য দিয়ে তেরখাদা একটি মডেল ও মানবিক উপজেলায় উন্নীত হবে

আব্দুল্লাহ আল মাহাদী:
চলমান সংকটকালে ‘ঢাকাস্থ তেরখাদা থানা এসোসিয়েশন’ তেরখাদা উপজেলাবাসীর জন্য সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতির শুরু হতে এখন পর্যন্ত নানা ধরনের কর্মসূচী অব্যহত রেখেছে সংগঠনটি। এতে স্থানীয় গরীব-অসহায় এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মুখে ফুটেছে হাসি, তারা জানিয়েছে নানা ভাষায় নানা রকম খুশির প্রতিক্রিয়া। কিছু প্রতিক্রিয়ার শব্দ মুখে উচ্চারিত না হলেও তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে আনন্দ, সেসব ছবি দেখে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী ও দাতারা।

জানা যায়, দেশে এই করোণা ভাইরাস আক্রমণের একদম শুরুতে যখন কোথাও তেমন বিস্তার লাভ করেনি, তখনই সংগঠনটি তাদের দূরদর্শিতায় সর্বপ্রথম গ্রামে গ্রামে মাইকিং করে জনসচেতনা বৃদ্ধির কাজ শুরু করে। এরপর রাস্তাঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জীবানু নাশক স্প্রেসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করে।

সংগঠনটির সভাপতি এস এম শওকত আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ পর্যন্ত তারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ৭ শ’র অধিক পরিবারকে খাদ্য সহযোগিতা দিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ৫ শ’ পরিবারকে ঈদ উপহার পৌঁছে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। তিনি বলেন, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা এবং গ্রাহকদের সম্মানার্থে তারা প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ খাবার ও ঈদ সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। শওকত জানান, সংগঠনটি যেহেতু ঢাকাস্থ তেরখাদাবাসীকে নিয়ে রাজধানীতেই পরিচালিত হয়, সেহেতু এখানেও তাদের অনেক সদস্য রয়েছেন যারা এই মূহুর্তে বিপদগ্রস্থ। এরকম অনেক পরিবারকে তারা গোপনীয়তার সাথে নগদ টাকা পৌঁছে দিয়েছেন এবং সার্বক্ষনিক খোঁজ খবরও রাখছেন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনাকালের শুরু হতে আরো বেশ কয়েকটি স্থানীয় সংগঠনও করোণা মোকাবেলায় মাঠে নামে, স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি তারাও প্রথমে জনসচেতনতামূলক কাজ দিয়ে নিজেদের কর্মসূচী শুরু করে। ফলে ঐ অঞ্চলের মানুষরা শুরু হতেই সতর্ক থাকায় এখনো পর্যন্ত সেখানে কোন সংক্রমনের খবর পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সমাজ সচেতন ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, সরকারি নর্থ খুলনা কলেজের প্রভাষক রবিউল ইসলাম রাজু সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, খুলনা জেলার অবহেলিত এই জনপদের মানুষ শুরু হতেই সতর্ক থাকায় এখনো সবাই সুস্থ রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনও জন নিরাপত্তায় কঠোর ভুমিকা পালন করছে বলে তিনি জানান।

এর আগে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তেরখাদা ইয়াংস্টার কমিউনিটির উদ্যোক্তা লস্কর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন এক সাক্ষাতকারে দাবী করেন যে, সেখানকার সাধারণ মানুষ শুরু হতেই সতর্ক রয়েছে, কোথাও বহিরাগামী কেউ প্রবেশ করলে এলাকাবাসী তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করছে। স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন সমাজ কল্যাণ ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গ সাধারণ মানুষকে নিয়মিত সাহায্য-সহযোগিতা ও দিক নির্দেশনার মাধ্যমে ঘরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করছে।

লিমন জানান, তার পরিচালনায় ‘তেরখাদা ইয়াংস্টার কমিউনিটি’ দীর্ঘদিন ধরে তেরখাদায় বিভিন্ন সমাজসেবা ও কল্যাণমূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলেই তিনি বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা হতে গ্রামে ফিরে যান, সেখানে গিয়ে তিনি তার সংগঠনের স্থানীয় কর্মীদের সহযোগিতায় ব্যাপক হারে কর্মসূচী পালন করছেন।

তিনি বলেন, সংগঠনের উপদেষ্টাম-লী, দাতা সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের সার্বিক সহযোগিতায় প্রথমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম যেমন, মাইকিং, পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণ এবং পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কয়েক দফা খাবার ও ইফতার পৌঁছে দেন। সংগঠনটি এ পর্যন্ত শতাধিক পরিবারকে প্রায় এক সপ্তাহের এককালীন বাজার পৌঁছে দেয় এবং আসন্ন ঈদে আরো প্রায় দেড় শ’ পরিবারকে ঈদের বাজার পৌঁছে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সূত্রমতে, শুরু হতে এখন পর্যন্ত সেখানে বেশ কয়েকটি সমাজসেবা সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তন্মধ্যে ঢাকাস্থ তেরখাদা থানা এসোসিয়েশন, তেরখাদা উপজেলা কল্যাণ সমিতি, তেরখাদা ইয়াংস্টার কমিউনিটি, তারুন্যের স্বপ্নসিড়ি, বারাসাত তরুণ সমাজ কল্যাণ পরিষদ, আটলিয়া দরিদ্র কল্যাণ ফাউন্ডেশন, হাড়িখালি যুব সংঘ ও বারাসাত স্কুল এলামনাই’র নানা মুখি কার্যক্রম ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে।

এছাড়া তেরখাদা অনলাইন তথ্যসেবা নামে ফেসবুক ভিত্তিক একটি গ্রুপ অনেক আগে থেকেই সেখানকার মানুষকে তথ্য সেবা দিয়ে আসলেও এই করোনাকালীন সময়ে তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন আপডেট এবং সামাজিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতি রক্ষাসহ সবরকম তথ্য সেবা নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি এই গ্রুপটি ‘প্রাণের তেরখাদা’ নামে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে সরাসরিও অংশ গ্রহন করছে। সর্বপ্রথম তারা তেরখাদার ভ্যানচালকদের মাঝে মাস্ক ও হ্যান্ডওয়াশ বিতরণ করে এবং জনসচেতনতায় বিভিন্ন ক্যাম্পেইন করে।

এ ব্যাপারে এর উদ্যোক্তা রবিউল ইসলাম রাজু সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্য পাওয়া সহজ হলেও সঠিক তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন, তাই আমরা অনেক আগে হতেই স্থানীয়ভাবে সকল প্রকার তথ্যসেবা দিয়ে আসছি। তিনি বলেন, বিশেষ করে এই করোনা পরিস্থিতিতে তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে, কেননা করোনা মোকাবেলায় প্রথম পদক্ষেপ হলো সতর্কতা অবলম্বন করা, আর সঠিক তথ্যই মানুষকে সতর্ক হতে সাহায্য করে থাকে। রাজুর এই ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা চেতনাকে স্বাগত জানিয়েছে সমাজের বিশিষ্ট জনরা।

এছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সমাজসেবী ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজ দরদী সাধারণ মানুষেরও বিভিন্ন কর্মকান্ড সেখানকার জনমনে স্বস্তির সৃষ্টি করেছে, ফুটিয়েছে অসহায় মানুষের মুখে হাসি। দেশে এবং প্রবাসে বিভিন্ন জায়গা হতে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির মানুষও গ্রামের মানুষের পাশে দাড়িয়েছে নিজ দায়িত্বে।

সাংবাদিক এনায়েত ফেরদৌস, পারভেজ মল্লিক, মেজবাউল আলম, মোল্যা ইখতিয়ার উদ্দিন, শাহজাহান শাহিম, কাজী শরিফুল ইসলাম (শফিক), শামছুল হক (কচি), অস্ট্রেলিয়া হতে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, পুলিশ সুপার শরিফুল ইসলাম ও সহকারী জজ লস্কর সোহলে রানা প্রমুখ নিজেদের সর্বোচ্চ সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন এলাকার মানুষের প্রতি। এছাড়া অনেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে নিজ নিজ পাড়া-মহল্লায় ও আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবর নিচ্ছেন প্রতিযোগিতা করে।

সাংবাবিদক এনায়েত ফেরদৌস বলেন, প্রত্যেক সাবলম্বী ব্যক্তি যদি অন্তত একটি পরিবারেরও খোঁজ খবর রাখে তাহলে এলাকার কোন মানুষের খাদ্য সংকটে পড়বেনা। তিনি মনে করেন, শুধু সরকার বা রাজনীতিকদের দায়িত্বে ছেড়ে না দিয়ে প্রত্যেকেরই নিজ নিজ মানবিকতা প্রদর্শনের সুযোগ এসেছে এখন এবং আমার এলাকার মানুষ সেই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে বলে আশা করি।
দেখা যাচ্ছে, চলমান এই সংকটে সেখানকার ছোট-বড় সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ পরস্পরকে সহযোগিতা করার এক প্রতিযোগিতায় নেমেছে, স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও অংশ নিচ্ছে এই কাজে।

‘মানুষ মানুষের জন্য’ এ কথাটির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠছে এই উপজেলায়। সারা দেশে সরকারি ত্রাণ বিতরণে চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের খবর প্রকাশিত হলেও এখনও পর্যন্ত তেরখাদায় এমন কোন খবর পাওয়া যায়নি। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখানে লক্ষ্য করা গেছে যে, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষকে সহযোগিতা করছেন তারা নিজেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তা পৌঁছে দিচ্ছেন।

এতে সন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলছেন, যার যার সাধ্য অনুযায়ী সকলে যদি এভাবে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসে তবে অদূর ভবিষ্যতে খুলনা জেলার অবহেলিত এই তেরখাদা উপজেলা একটি মডেল ও মানবিক উপজেলায় পরিণত হবে। করোণা এসেই এখানকার মানুষকে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে বলে সবার বিশ্বাস।

Facebook Comments
advertisement

Posted ৫:০০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২০ মে ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮  
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
প্রধান প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com