শুক্রবার ৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং আমাদের দুঃস্বপ্ন

  |   শনিবার, ০৯ মে ২০২০

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং আমাদের দুঃস্বপ্ন

আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি আবার বেশ আলোচনায় আসতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, লেখক, ব্লগার ও কার্টুনিস্টের বিরুদ্ধে এ আইনে মামলা এবং গ্রেফতারের ঘটনায় বিশিষ্টজনদের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ফেসবুক ব্যবহারের বিধিনিষেধ নিয়েও একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সম্প্রতি, যা জনমনে বেশ ভীতির সঞ্চার করেছে। ইদানীং সোস্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে রেখেছে এই খবরগুলো।

করোণা আতংকের সাথে আরেকটা নতুন আতংক যোগ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। কম বেশি প্রায় সকলেই ফেসবুকে নিজের এক্টিভিটি লগ চেক করে দেখছেন যে তিনি কোনভাবে ফেঁসে যাচ্ছেন কিনা, অনেকে আবার নিজেকে বাঁচানোর উদ্দেশে নিজের টাইমলাইনে সাবধান বাণী পোস্ট করে রেখেছেন যে তাকে যেন কেউ কোন বেআইনি পোস্ট ট্যাগ না করে কিংবা কোন রাস্ট্রবিরোধী গ্রুপে সংযুক্ত না করে। সাধারণ মানুষের এই আতংক সচেতনতায় রুপ নিলে তা অবশ্যই ভালো, তবে তা যদি হয় পরাধীনতার নামান্তর তবে আমরা অবশ্যই তথ্য সংকট বা তথ্য বিচ্ছিন্নতায় পড়বো, যা একটি যুগোপযোগী রাষ্ট্র গঠন ও বিশ্বায়নের অন্তরায় সৃষ্টি করবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ কার্যকর হওয়ার শুরু হতেই অনেকে যেমন এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, অনেকে আবার আশংকাও করেছিলেন যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনে এ আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তাই শুরু হতেই আইনটি নিয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা এর বিরোধিতা করে আসছিলেন, আজ তারা সেই আশংকাকে বাস্তব দুঃস্বপ্ন বলে আখ্যা দিয়ে আইনটি বাতিলের দাবী নিয়ে স্বোচ্চার হয়েছেন।

webnewsdesign.com

একটি গণমাধ্যম মানে কেবল প্রচাণামূলক কিছু সংবাদ পরিবশন করা বা সরকারের গুণগান প্রচার করা নয়, বরং গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পন হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। সমাজের ভালো কাজগুলোকে যেমন তুলে ধরা সাংবাদিকদের কাজ তেমন সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি প্রকাশ করা এবং প্রশাসনের ভুল ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেয়া গণমাধ্যমের একটা সহজাত দায়িত্ব৷ যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকে ঘুরেফিরে তারাই সংবাদের শিরোনাম হন, এটা খুবই স্বাভাবিক, কেননা, যারা কাজ করেন আলোচনা-সমালোচনা তো তাদের নিয়েই হবে।

আর দুর্যোগ বা মহামারীর মত পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের যেহেতু স্বাভাবিক রুটিনের বাইরে নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে হয়, সেহেতু গণমাধ্যম কর্মীদেরকেও অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে বেশি সজাগ থাকতে হয়। এক্ষেত্রে কোন সরকারের বিপক্ষে কোন মত প্রকাশ করা এবং কোন নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে মত প্রকাশ করা মোটেও এক কথা নয়। সরকার যেমন কোন দলের জন্য নির্দিষ্ট নয়, তেমন গণমাধ্যমও কোন দলের ঠিকাদার হতে পারেনা। গণমাধ্যমগুলো সবসময় সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে, সরকার এই দর্পনের সাহায্যেই সমাজের সকল অবস্থা পরিলক্ষণ করে থাকে, সরকার প্রধান তার সহকর্মীদের ব্যাপারে খোঁজ খবর জানতে পারেন।

প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক সরকার সংবাদকর্মীদেরকে উত্তম বন্ধু ভাবার কথা। কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য যে, কেবল বর্তমান সরকারই নয় বরং প্রত্যেক সরকারের ব্যাপারেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের নানা রকম অভিযোগ রয়েছে, অভিযোগ রয়েছে সাংবাদিকদেরকে টুটি চেপে ধরার। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি নানামুখী অপরাধ ও গুজববিরোধী ভুমিকা রাখলেও বিশিষ্টজনরা শুরু হতে অভিযোগ করছেন যে, এই আইনটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার জন্যই বেশি ভুমিকা রাখছে।

যেখানে কোন ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে মানহানিকর কিছু প্রচার করা হলে দন্ডবিধি-১৮৬০ অনুযায়ী মানহানির মামালা দায়েরের সুযোগ রয়েছে, তা সত্ত্বেও যখন একই রকম ঘটনায় ডিজিটাল আইনে মামলা করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখা যায় তখন প্রতিকারের চাইতে সাংবাদিকদেরকে ভয় দেখানোটাকেই মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করেন অনেকে। ডিজিটাল আইনকে যদি এভাবে যত্রতত্র ভয়-ভীতি দেখানোর কাজে প্রয়োগ করতে থাকা হয় তবে আইনটা এক সময় তার নিজস্ব গাম্ভীর্যতা হারাতে পারে বলেও আশংকা করা যায়।

আইনের প্রতি আগাগোড়াই যাদের সম্মান রয়েছে , তারা আইনের ব্যাপারে সরাসরি কোন প্রশ্ন না তুললেও আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে এবং কতটা জন কল্যাণ নিশ্চিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আইনের প্রত্যেকটি ধারা মেনে চলার মত পরিবেশ আমরা এখনও নিশ্চিত করতে পেরেছি কিনা তাও বিবেচনার দাবী রয়েছে। যেখানে অনলাইন মিডিয়া গুলোকে এখনো কোন কার্যকর নীতিমালার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি, সেখানে কোন্ খবরটি সত্য আর কোনটি গুজব তা যাচাই করার কোন সুযোগই নেই পাঠকের কাছে। এমনকি লাইসেন্সধারী বড় বড় মিডিয়ার নামেও অসংখ্য ফেক সাইট রয়েছে অনলাইনে, টিভি চ্যানেলের নামেও অনেক ভুয়া ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। অথচ বর্তমান এই করোণা পরিস্থিতিতে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো কতটা বেশি গুরুত্ব বহন করছে তা সবার জানা।

যেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার কোন সুযোগই নাই, সেখানে ফেসবুকের লাইক কমেন্ট বা শেয়ার অপশন যেকোন সাধারণ সহজ সরল মানুষকেও বিপদে ফেলতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে মনের ভুলেও নিজের আঙুলের খোঁচায় বা বাড়ির ছোট্ট অবুঝ শিশুদের হাতে লাইক বা শেয়ার হয়ে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে, তার কার্যকরীতা কতদূর, সেসব ঠিক করতে না পারলে ডিজিটাল আইনের ফাঁদে অনেক মানুষই বিপদে পড়ার আশংকায় ডিজিটাল মাধ্যমগুলো হতে বিমুখ হয়ে যেতে পারে।

অথচ বর্তমানে সবচেয়ে বড় মিডিয়া হলো সোস্যাল মিডিয়া। বর্তমান যুগে হাতের মুঠে গোটা দুনিয়া বলতে আমরা এই মিডিয়াকেই মূলত বুঝে থাকি। দুনিয়ার এমন কোন প্রিন্ট বা ইলেকট্রিক মিডিয়া নেই যা সোস্যাল মিডিয়ার চাইতে বেশি শক্তি অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু এই মিডিয়ার নির্ভরযোগ্যতা সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস কোনটিই পুরোপুরি করা যায় না। তথাপি সোস্যাল মিডিয়ার যে জনপ্রিয়তা তা কোনভাবেই আটকে রাখা যাবেনা। সত্য বা বানোয়াট যাইহোক না কেন মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি খবর পায় এই মিডিয়ায় এবং তা তারা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।

অনেকে দায়িত্ববোধ হতেই চিন্তা করে যে, সংবাদটি শেয়ার করা অবশ্যই উচিত। যেমনটি জানাচ্ছিলেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা আশিক চৌধুরী, গত দুদিন আগে রাত আড়াইটার দিকে তিনি ফেসবুকে জানতে পারেন যে তার বাসার কাছাকাছি কোথাও ডাকাত এসে হানা দিয়েছে। সবাইকে সতর্ক হতে বলা হয়েছে ঐ পোস্টে। এত রাতে এই ঘটনাকে কীভাবে সত্য-মিথ্যার বিচার করবে তা না বুঝেই পোস্টটি জন সতর্কতার স্বার্থে শেয়ার করে দেন তিনি। এরপর তিনি নিজেও দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখেন যে, দরজার তিনটা সিটকানির মাত্র একটি লাগানো হয়েছে, বাকি দুটো খোলা, ঐ পোস্ট দেখে দ্রুত দরজাটা শক্ত করে আটকিয়ে দেন এবং সতর্ক থাকার চেষ্টা করেন তিনি। এখন যদি ঐ ডাকাতির ঘটনাটি মিথ্যা হয় এবং ডাকাতদের কোন সংস্থা বা সংগঠন ডিজিটাল আইনে মামলা দায়ের করে তাহলে অবশ্যই ফেঁসে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই বলে আশংকা প্রকাশ করলেন আশিক৷

এজন্য সোস্যাল মিডিয়াকে কেবল সোস্যাল মিডিয়া বা নেটওয়ার্কের জায়গায় রেখে মূল্যান করা যায় কিনা তা কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে। পাশাপাশি তথ্য সরবরাহকারী যে সাইটগুলো রয়েছে সেগুলোকে অবশ্যই একটি নীতিমালার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। কেননা এই অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো এখন আধুনিক বিশ্বের একটি অন্যতম অংশ, যা অস্বীকার বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনলাইন নিউজের সুবাদেই এখন কাউকে আর খবরের জন্য পরদিন পত্রিকাওয়ালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়না, টাইম টু টাইম খবর দেখার অপেক্ষায় রিমোট নিয়েও টিভির সামনে বসে থকতে হয়না। এখন ২৪ ঘন্টায় প্রতি মূহুর্তে আপডেট পাওয়া যায়, কে কতটা দ্রুত আপডেট দিতে পারে সেই প্রতিযোগিতা চলে এখন অনলাইন নিউজ মাধ্যমে, যা আমাদেরকে দ্রুত গতিশীল করে তোলে।

অনলাইনের এমন জনপ্রিয়তা দেখে প্রায় সকল প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রিক মিডিয়াও যুগের সাথে তাল মেলাতে নিজেদের একটা করে অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালু করেছে।

কিন্তু এত বছরেও সরকার কী পেরেছে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর ব্যাপারে কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে? এখন এক দেড় হাজার টাকা হলেই একটা অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালু করে দেয়া যায়, শুদ্ধ বানানে একটা লাইন লিখতে না পারলেও সেসব পত্রিকার সম্পাদক হওয়া যায় এবং সাংবাদিক কাকে বলে তার কোন সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্য নাই। অধিকাংশ অনলাইন পোর্টালগুলোর বেতনভুক্ত একজন সাংবাদিকও নাই, ৫০০ টাকা মাসিক বিলের একটা ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই কপি-পেস্ট করে সব চালিয়ে দেয়া যায়। তাহলে পাঠক এখন কোন মিডিয়ার সংবাদ বিশ্বাস করবে এবং কোনটিকে বানোয়াট বা গুজব মনে করবে তা কে ঠিক করে দেবে? সরকার যেখানে বারবার জনগনকে তথ্য জানার অধিকারের কথা বলছে সেখানে পিওর তথ্যেরই কোন নিশ্চতা নেই।

অনেক ফ্রি ব্লগ সাইট বা সফটওয়ারও রয়েছে, যেখানে কোন টেক্সট পোস্ট করে ফেসবুকে শেয়ার করলে সাধারণ পাঠক স্বাভাবিকভাবেই সেগুলোকে কোন অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিউজের লিংক ভাবতে শুরু করেন, এতে পাঠকের দোষ কী? অলাইন নিউজ পোর্টালের কী কোন সঠিক তালিকা পাঠকের জানা আছে? অসংখ্য নিউজ পোর্টাল রয়েছে অনলাইনে, প্রতিদিন নতুন নতুন সৃষ্টিও হচ্ছে। তাহলে কী পাঠক কারো সাথে কোন তথ্যই শেয়ার করতে পারবে না? ডিজিটাল আইনের ফাঁদে ডিজিটাল দেশ গঠন কেবলই দুঃস্বপ্নে রুপ নেয়ার এমন আশংকা করছেন এখন অনেকই।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১২:২১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৯ মে ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

(174 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
প্রধান প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com