শনিবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

নীলশির

ফিরোজ আল সাবাহ্   |   মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর ২০২০

নীলশির

নীলশির । ফটোগ্রাফার ফিরোজ আল সাবাহ্

সেই দিনের ব্যার্থতার গল্প মনে আছে ? কাঞ্চনজঙ্ঘা না দেখে ফিরছিলাম । ভোর চারটায় তেতুলিয়া গিয়ে কুয়াশা দেখে সবাই হতাশ । আমি অবশ্য সকালটা উপভোগ করছিলাম । ব্যার্থতা আর হতাশা আমাকে ছোয় না । এগুলো থেকে শিখি , উপভোগ করি । প্রতিটা সকালই তো নতুন জীবন ।

আসার সময় পথিমধ্যে রাস্তার পাশে এক মেঘ হও মাছরাঙ্গার দেখা ।ঠায় বসে আছে সে। মাথা নিচু করে পানির দিকে একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে আছে । কোন মাছের যে আজ ভবলীলা সাঙ্গ হবে কে জানে । বাইক ব্রেক করে দেখি ছবি তোলার মত অবস্থা নেই । সেখানেই কিছুক্ষন বসে থাকলাম তুষারসহ । এর পর মনে হলো কাঞ্চনজঙ্ঘা তো দেখা হলো না । পাখি দেখি । ঘুরতে ঘুরতে করতোয়ার কাছে চলে গেলাম । পাখি খুজতেছি জেনে একটা ছোট জলাভুমি দেখিয়ে দিল এক লোক । সেখানে নাকি বালিহাঁস থাকে শীতে । তাদের কাছে সব হাঁসই বালিহাঁস ।

চা বাগানের সরু রাস্তা ধরে এদিক সেদিক খুজে বের করলাম সে জলাভুমি । আয়তনে তেমন বড় নয় । চারিদিকে ধান মাঝে একটু নিচু জায়গায় পানি হাটু পানি। একটা সরালি হাঁসের ঝাক কিচির মিচির করছে । হাসেরা কেও গোসল করছে, কেও ডানা পাখনা মেইনট্যানেন্স করছে। এদিক সেদিক কিছু বক । ধবধবে সাদা বকেদের সবুজের মাঝে উড়াউড়ি টা বেশ লাগে দেখতে । জলাভুমিটা জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভর্তি ।

লম্বা পাইপের মত সব উদ্ভিদ । কিছুক্ষন সরালির ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম কয়েকটা Common Teal ও আছে । গাছের নিচে তুষার সহ বসে গাল গপ্পো করছিলাম আর টুকটাক ছবি তুলছিলাম । ভাবলাম দুপুর তো হয়ে এলো ভজন পুর গিয়ে খেয়ে ফিরতি পথ ধরবো ।হুট করে দেখি গৃহপালিত একটা হাঁস উড়াল দিলো , । প্রথম মুহুর্তে ভেবেছিলাম দৌড়ে সামনে বসবে আবার । কিন্তু না হাঁসটি উড়তেই থাকলো । একি কান্ড বাসার পালা হাঁস উড়ে যাচ্ছে । উড়তে উড়তে অনেক উপরে উঠে গেল । কয়েকটা চক্কর মেরে আবার বসলো জলাশয়ের মাঝে । এক লোক গরু নিয়ে কাছে চলে গয়েছিল তাই বোধ করি বেচারা উড়ে গিয়ে আরেকদিক বসলো ।
হাঁসটি উড়ার মুহুর্তেই মন খুশীতে ভরে গেছে কারন Mallard Duc k দেখেছি । একেবারেই নতুন পাখি আমার কাছে । কত কত দিন পর নতুন পাখি দেখলাম । এটা এক অন্যরকম আনন্দের ব্যাপার । যারা পাখির পিছনে ছোটে তারা বুঝবেীই অনুভুতি

নতুন পাখি দেখা তো হলো এখন ছবি তুলতে হবে যে ! এক পিচ্চি সাথে ছিলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম নামা যাবে কিনা বিলে । সে যে ভয় দেখালো তাতে পিলে চমকে গেল । বিল নাকি জোক দিয়ে ভর্তি । সাপ হলে আমি খুশি সে যেই সাপ ই হোক । কিন্তু জোঁকে আমার অস্বস্থি বেশি । দেখলে গা বিলবিল করে । বনে জঙ্গলে এই একটা জিনিশ আমাকে বিপদে ফেলে । বিলে না নামলেও উপায় নেই । ৩৬ মিলিমিটার সেন্সর ইদানিং আমাকে বেশ বিপদে ফেলেছে । লেন্সের দৌড় কমে গেছে । কাছে যেতে না পারলে ভালো ছবি পাবোনা । কেন যেন মনে হলো এখন বিলে জোঁক থাকার কথা না । নেমে পরলাম হাফ প্যান্ট পড়ে । কিছুক্ষন হাটার পর মনে হলো জোঁক নেই কিন্তু আরো ভয়ানক জিনিশ ঘাপটি মেরে আছে পানির নিচে । কি এক জ্বালা !!

জলাশয়টায় পাট চাষ করা হয়েছিল । পাট কাটার পর পাঁটের মুড়ি রয়ে গিয়েছে । সাথে তেরচা করে কাটা পাঁটের গোড়া । উপরে পা দিলে পা এফোড় ওফোড় হবে নিশ্চিত । সাবধানে পা ফেলে ফেলে এগোচ্ছিলাম , ভুল হলে খবর !! ছবি তুলতে গিয়ে বুঝলাম হাঁসটা মারাত্বক লেভেলের ফাজিল । আমি এক পা এগুলে সে দশ হাত ভেসে দূরে চলে যায় । সেদিন আর তেমন ছবি পেলাম না । সে ঝোপের আড়ালেই রইলো । সেদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির কানে বাড়ি ফিরতে হলো ।

তারপর দিন গেলাম শরীফ সহ একেবারে প্রস্তুতি নিয়ে । পায়ে তেল মেখে ।কারন এ পানিতে নামলে পা প্রচন্ড চুলকোয় । সেদিন প্রায় সারাদিন ঘাপটি মেরে ছিলাম বিলের পানিতে । খুব কাছ থেকে দেখেছি হাঁসটি । কিছুক্ষন পর দেখলাম যুবক হাঁসা একা নয় সাথে তরুণী হাঁসি ও আছে আছে । দুজনে আমাকে ফাঁকি দিয়ে বেশ জলকেলীতে মত্ত । তোমরা বুনো হাঁস হলে আমিও জংলী । একবার তো ভুলে কাছে আসবে বাছাধনেরা । আছি তো বসে ।

এই হাঁসের বাংলা নাম নীলশির । অসম্ভব সুন্দর নাম ।
আমরা যে এখন বাসায় হাঁস পালি। যারা খেয়ে দেয়ে হাঁটতে পারেনা । সারাদিন প্যাক প্যাক করে এই নীলশির হাঁস হলো তাদের পুর্বপুরুষ । প্রায় পৃথিবীজুড়ে গৃহপালিত হাঁসের পুর্বপুরুষ হলো এই অসাধারন হাঁসটি , যা এখনো বুনো জীবনেই অভ্যস্ত ।তারা এখনো ডালা মেলে নীল আকাশে । বুনো ডানায় ভর করে পাড়ি দেয় হাজার হাজার কিলোমিটার পথ ।

অনেক ইচ্ছে ছিলো এই পাখিটি দেখার যার বংশধরেরা এখনো বাড়ির আশে পাশে প্যাক প্যাক করে । হাঁসটি আমাদের দেশে বিরল বটে । দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো চিরচেনা হাঁসের পুর্বপুরুষদের । যারা এখনো স্বাধীন । পুরো পৃথিবী জুরে যারা এখনো নিজেদের বুনোসত্ত্বা বুকে ধারন করে ।
শীতের শুরুতে উত্তর গোলার্ধের দেশ যেমন সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া , চীন থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভুটান , নেপাল ভারতের উপর দিয়ে আমাদের দেশে আসে এই নীলশির হাঁস । বিরল সে হাঁসের দেখা পাওয়া নিঃসন্দেহে ভাগ্যের ব্যাপার । সৃষ্টিকর্তা সে সুযোগ দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ ।

শরিফ সহ নেমে পড়লাম জলায় । জলার মধ্যে গেলে মোটামুটি সুবিধা করা যাবে । গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকা লাগবে । তাহলে লাইটে ব্যবহার ভালো হবে । সে জলায় হাঁটা আর ব্লেডের আগায় হাটা একি ব্যাপার । ফু দিয়ে দিয়ে হাটি এমন অবস্থা । পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পা অবশ অবস্থা ক্যামেরার ভারে হাত টনটন করছে ।
শেষ বিকেলে সে ভাসতে ভাসতে ঝোপের ভেতর থেকে সামনে এসেছিলো । আমরা সুর্যকে পেছনে রেখে তার সোনালী আলোয় দেখেছিলাম হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে উড়ে আসা দুটি ডানা । শেষ বিকেলের সোনালী আলোয় চকচক করছিলো ডানা দুটি ।

আমাদের ও চোখ চকচক করেছিলো নিশ্চই । হাঁসটি কি দেখেছিলো ?

Facebook Comments
advertisement

Posted ১:২৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(35 বার পঠিত)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮  
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
প্রধান প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com