শুক্রবার ১৬ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে স্বপ্নের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

শেখ মাজেদুল হক   |   সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২০

প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে স্বপ্নের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। উত্তরের জনপদের এক আশা-আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর। রংপুরের মাটি ও মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল এই অঞ্চলে যেন একটি মান সম্পন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলা হয়। যেখানে এ অঞ্চলের ছেলে মেয়েরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অংশ নিয়ে সুনাগরিক হয়ে উঠবে। দেশ ও দশের মুখ আলোকিত করবে। বিশ্ববিদ্যালয় করার সেই দাবি কিছুটা বাস্তবায়নের মুখ দেখেছিল ২০০১ সালে।

তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় রংপুরে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে সে প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। রংপুরের মানুষ তাদের স্বপ্ন ভাঙার হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা থেমে থাকে না।

সমাজের সুধীজন ও সচেতন নাগরিক, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, সমাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও আপামর সব মানুষ এই দাবিকে আরো জোরালো করে তুলে। সবার মুখে এক দাবি যে রংপুরের বুকে একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হোক, যে বিশ্ববিদ্যালয় এই উত্তরের অবহেলিত মানুষকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের দীর্ঘদিনের দুঃখ কষ্ট ঘুচাবে। নিজেরা জ্ঞান অর্জন করে সেবা করার জন্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।

এজন্যই আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার দাবিতে অনড় থেকে যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে এলো সেই স্বপ্নের মাহেন্দ্রক্ষণ ২০০৮ সাল। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রংপুরের মানুষের যৌক্তিক দাবির প্রতি সাড়া দেয়। পূর্বের পরিকল্পিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানকেই তারা বেছে নেয় রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার জন্য।

২০০৮ সালের ১২ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুরের মানুষের প্রাণের দাবি রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়। চারদিকে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, এমনকি রংপুর শহরের বিভিন্ন জায়গায় মিষ্টি বিতরণও হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বাস্তবায়নের কথা শুনে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান। এরপরেও অনিশ্চয়তার কালো মেঘ কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার পর থেকেই শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য সর্বস্তরের মানুষ ব্যাপক চাপ প্রয়োগ শুরু করে।

এরপর অস্থায়ীভাবে রংপুর টিচার্স ট্রেনিং কলেজের একটি পরিত্যক্ত ভবনে উপাচার্য মহোদয় একজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন ও প্রাথমিক কাজ শুরু করেন। কারমাইকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. দীপকেন্দ্র নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তার সহযোগীদেরকে সাথে নিয়ে ব্যাপক সহযোগিতা করে প্রথম বছরের ভর্তির কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেন।

এই সেই বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শিক্ষার্থীদের আগে ভর্তি করানো হয়েছে পরে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তৎকালীন প্রথম উপাচার্য রিকশায় করে মানহীন চেয়ার টেবিলে বসে ধার করা পরিত্যক্ত ভবনে অফিস করা শুরু করলেন। প্রথম রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন মিয়া। প্রথম ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পান সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ মোজাম্মেল হক। প্রথম শিক্ষক গণিত বিভাগের ড. মোঃ তাজুল ইসলাম, প্রথম কর্মকর্তা হারুন তারিফ জয়। প্রথম কর্মচারী ফজলু মিয়া।

২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ৬টি বিভাগ, ভর্তিকৃত ৩০০ জন শিক্ষার্থী ১২ জন শিক্ষক নিয়ে কাঠাল তলার টিটি কলেজের পরিত্যক্ত ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের গবেষক ও অধ্যাপক প্রফেসর ড. আবদুল জলিল মিয়া। উনার দৃঢ় নেতৃত্বে পরবর্তীতে ৬ অনুষদ এবং ২১ টি বিভাগ খোলা হয়।

২০০৮ সালের ১২ ই অক্টোবর রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলেও ২০০৯ সালে এর নাম পরিবর্তন করে নারী জাগরণের অগ্রদূত, মহীয়সী নারীর নামে নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ৪ ই জানুয়ারি ২০১১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭৫ একরের স্থায়ী ক্যাম্পাসের শুভ উদ্বোধন করেন। ২০১১ সালে ১৪ ই ফেব্রুয়ারি চারটি একাডেমিক ভবন এবং প্রশাসনিক ভবন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয় একযুগ পূর্তি।

নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অসীমের সন্ধান করে চলছে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেশে এবং দেশের বাহিরে নানা জায়গায় নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর বহন করে চলছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও দেশের বাহিরে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতিমধ্যেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা, শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি খেলাধুলায় অনেক সুনাম অর্জন করেছে। আলোকিত সুনাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে ।

২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩৫ হাজার নানা প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। প্রশাসনিক সহযোগিতায় ডক্টর তুহিন ওয়াদুদের নেতৃত্বে এ বৃক্ষরোপণ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ এর অসামান্য কাজটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সুধীজনদের সহযোগিতায় সুসম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম পর্যায়ের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচাইতে প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিনন্দন এক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে অর্জন করেছে প্রধানমন্ত্রী এবং দ্বিজেন শর্মা পুরস্কার। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যের নীলাভূমির দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থান করে নিয়েছে সমসাময়িকদের শীর্ষে। জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান সৃষ্টি এবং বিতরণে নিরলসভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কাজ করে যাচ্ছে।

ইতিমধ্যেই ভর্তি হয়েছে ১২ টি ব্যাচ। তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর উন নবী। বর্তমান উপাচার্য হিসেবে নিরলস নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন প্রফেসর ডক্টর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বিএনসিসিও। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা ১৮৭জন, কর্মকর্তা ১৩১ জন, কর্মচারী ৪৪৯ জন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উপাদান শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮৫০০।

শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রগতি এবং সামাজিক নানা জায়গায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অবদান গুরুত্বের সহিত পালন করে যাচ্ছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে বড় শক্তি হচ্ছে তার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের গবেষণা এবং নিয়মিত পাঠ দানের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা ক্ষেত্রে আশার সঞ্চার করেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে গবেষণা মাধ্যমে দেশ এবং জাতির সম্মান বৃদ্ধি করছে। অপার সম্ভাবনার নাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। সীমাহীন ভালোবাসা প্রিয় ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের জন্য সবসময়। সংকট থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু করা এ বিশ্ববিদ্যালটি আরো অনেকদূর এগিয়ে যাবে এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

সেজন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী,কর্মকর্তা-কর্মচারী এলাকাবাসী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্বদের যৌথ প্রচেষ্টা অতীব প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে মানবতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্তমান ও ভবিষ্যত নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম মানব সম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং বিকশিত করার ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে অসামান্য অবদান রেখেছেন তাদের সকলের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও নিরন্তর ভালোবাসা। ভালো থাকুক আমাদের প্রাণের ক্যাম্পাস, আলো ছড়াক যুগ যুগ ধরে।

লেখক:
সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান
মার্কেটিং বিভাগ,
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

Facebook Comments
advertisement

Posted ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
প্রধান প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com