বৃহস্পতিবার ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

পর্ব -২

বগালেক, কেওক্রাডং ভ্রমণ

জিয়াসমিন আক্তার   |   সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০

বগালেক, কেওক্রাডং ভ্রমণ

রুমাবাজার পার হতেই বড় বড় পাহাড় বেয়ে ওঠা শুরু হলো! চান্দের গাড়ির পাইলট মুস্তাক ভাই এতো দক্ষ চালক কি আর বলব। ঐ যে বলেছিলাম আনন্দ আর ভয় এর মিশেল অনুভব, একদিকে চারপাশ ঘিরে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, আর অন্য দিকে খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় উপরে ওঠা আবার নামা দুটোই যে কতটা বিপদজনক তা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা।

তারওপর আমরা চারজনই একটি পরিবার এবং একই সাথে। মানে কোনভাবে যদি গাড়ির কিছু উল্টো পাল্টা হয় তাহলো ছিটকে গিয়ে কোথায় যে পড়ব কোন হদিস পাওয়া যাবে না।

ঠিক ওই মুহূর্ত টা আমার খুবই ভয় লাগছিলো। বলতে পারেন অনেকটা অপরাধী লাগছিলো এই ভেবে যে, আমরা আসছি ভালো কথা কিন্তু বাচ্চা দুটোকে কেনো আনলাম এই ভয়ংকর বিপদজনক ট্যুরে। কিন্তু আসলে আমাদের কিছু করার ছিলোনা। বাচ্চা দুটো কিছুতেই তাদের বাবা ও মা কে ছাড়ে না, সাথে আনতেই হয়!
আমি দোয়া পড়ছি, কিন্তু আমার ছেলে মেয়ের কি ফুর্তি! তারা বলছিলো-” আম্মু পার্কে এমন একটা রাইড আছে, উঁচু তে ওঠে আবার নিচে নামে! তাই দারুণ মজা লাগছে! ”

আমি আর কি বলব মনে মনে দোয়াই পড়ছি, আর খানিক রিস্ক নিয়েই ভিডিও করছি, কারণ এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি সময়ে সময়ে মনে করা যাবে।
ইউটিউবে কোন ভিডিওতে কিন্তু এই রাস্তার কথা বলেনি ওরা। যাদের হার্ট দূর্বল তাদের আসতে নিষেধ করব, তারা সহ্য করতে পারবেন না।
অবশেষে ভূ- পৃষ্ঠ থেকে ১২০০ ফুট উঁচু পাহাড় চড়ে চোখে পড়লো সেই বগালেক!

webnewsdesign.com

বগালেক সম্পর্কে একটু বলি-
বগালেক প্রায় ২০০০ বছর পূর্বে ১৫ একর জায়গা জুড়ে সৃষ্ট প্রাকৃতিক হ্রদ ! ভূতত্ত্ববিদ এর মতে এটি কোন মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা কোন উল্কাপিন্ডের পতনে সৃষ্ট! চারদিকে বড় বড় পাহাড় বেস্টিত স্বচ্ছ জলের লেক! খুব শান্ত মায়াময়! পাহাড়ের বুকে অথবা পাহাড় বুকে নিয়ে সুস্থির! আকাশ, পাহাড় আর জলের পশরা, স্থানীয় নানা থিম রয়েছে এই লেককে ঘিরে।এর জলে কিছু লাল ও নীল শাপলা ফুটে আছে, প্রচুর মাছ আছে। কিন্তু খুবই গভীর, প্রায় ১৫০-২০০ ফুট! জলের পাড়ে আপনি গোসল সেরে নিতে পারবেন, বোটে ঘুরতে পারবেন কিন্তু একেবারে নেমে পড়া সম্পূর্ণ নিষেধ!

আমরা বগালেক পৌঁছে আর্মিক্যাম্প এ নাম এন্ট্রি করলাম। একদমই লেকের পাড়ে একটি কটেজ আমাদের দেয়া হলো। সেখানে ব্যাগ রেখে প্রচন্ড ক্লান্তিকে তুলে নিয়ে জলে ফেলব বলে রওনা হলাম লেকে গোসল এর উদ্দেশ্যে!

গোসল খাওয়া সেরে বেলা তখন তিনটা, শরীর যেনো আর চলছে না। সারারাত বাস জার্নি, আবার নেমেই চান্দের গাড়ি জার্নি, খুব ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন। সেই ভেবে ঘন্টা খানিক বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। কিন্তু শুধু ঘুমিয়ে কাটালে তো হবে না, সময় খুব কম। এতো দূর থেকে আসা, প্রতিটি মুহূর্তই যতটা পারা যায় অনুভবের জন্যই তো।
বিকালে পুরো পাড়াটা ঘুরে দেখলাম। তারা সকলেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, শিশুরা দল বেঁধে খেলছে। মেয়েরা যার যার কাজ করছে। পাহাড়ি উপজাতি নিঃসন্দেহে জন্মগত ভাবেই পরিশ্রমী। চোখে পড়লো অনেকে পাহাড়ি বন থেকে কাধে ঝুলানো বিশেষ ঝুড়িতে নানা ফসল, ফল নিয়ে বাড়ি ফিরছে।

দূর থেকে বগালেকএর পাশের পাহাড় গুলোকে এতটা কাছে আর রহস্যময় মনে হয়, যে ইচ্ছে করে শুধু চেয়ে থাকি। আমরা অনেকটা দূরে এগিয়ে গেলাম পথ ধরে, কিন্তু যতই কাছে যাই পাহাড় যেনো সরে সরে যায়, আর আরও কাছে যেতে নীরবে ডাকে।

সন্ধ্যায় আমরা একটা দোকানে বসলাম পাহাড়ি পেঁপে খাওয়ার জন্য। বেশ বড় একটি পাকা পেঁপে সস্তায় কিনে নিলাম। ওরা খুব যত্ন করে কেটে এনে দিলো। আমার যে কোন ফল ভীষণ প্রিয়, আর এতো নির্ভেজাল ফল খাওয়ার সৌভাগ্য কে হাতছাড়া করে। প্রচুর খাওয়া হলো, চা খাওয়া হলো। একটু দূরে একটি চার্জ, সেখান থেকে বিশেষ কোন বাদ্যযন্ত্রের তালে সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সঙ্গিত এর সুর ভেসে আসছে।

সে এক অন্যরকম আবহে, অন্যরকম সন্ধ্যা! মনে থাকবে, মনে পড়বে।
আমাদের গাইড পবন দাদা সবসময়ই সাথে আছেন, তার আন্তরিক সেবা দিতে। রাতে তিনি মুরগীর বারবিকিউ করবেন। সেগুলো লুচি দিয়ে খাওয়া হবে। আমার বাচ্চারা খুবই এক্সাইটেড। সন্ধ্যার পর পরই বিশাল আকাশটি তারায় তারায় খচিত এক ঝিলমিল পশমি কাপড়ের সামিয়ানা আমাদের মাথার পরে। আর একটানা ঝি ঝি সঙ্গীতে চারদিক মুহূর্মুহু!

এতোবড় খোলা আকাশ ঐ শহরের ছাদ থেকে দেখা যায় না। মনটা কেমন আনমনে হয়ে ওঠে। সে অনুভব আপনাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে, যেখানে সব মানুষই নিজের সাথে দেখা করে, কথা বলে!

বারবিকিউ তৈরী, খাওয়া, তারপর ঘুমের প্রস্তুতি! খুব ভোরে উঠে রওনা হতে হবে। পায়ে হেঁটে ১৩ কিলোমিটার, তাও আবার সমতলের মানুষ পাহাড় বাওয়া। সত্যিই জানিনা তখন আমরা কি হতে যাচ্ছে আগামীকাল! আমরা কি পারব আমাদের সবচেয়ে কঠিন এই ট্যুরের শেষ গন্তব্য কেওক্রাডং সুস্থভাবে পৌঁছতে!
—– চলবে

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৪১ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

নীলশির
নীলশির

(603 বার পঠিত)

(141 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com