শুক্রবার ৩০শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

হিমশীতল জলে বেঁচে থাকার লড়াই

  |   বুধবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

হিমশীতল জলে বেঁচে থাকার লড়াই

এস কে দোয়েল
———-
এবারের হাঁড়কাপানো শীতে দূর্ভোগের শেষ নেই। টানা শীতের দাপট আর শৈত্যপ্রবাহে ঘর হতে বের হওয়া ছিল দায়। কিন্তু এই কঠিন শীতকে হার মানিয়েছে বরফগলা জলে জীবন পাথরের লড়াই। প্রকোপ শীতকে উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে নেমে পড়ছে নদীতে। পেটের ক্ষুধা আর পরিবারের মৌলিকা চাহিদা পূরণ করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানকৌড়ির মতো পানিতে ডুবে ডুবে তুলে পাথর। সন্ধ্যায় কঠিন পরিশ্রমের উত্তোলিত পাথর মহাজনের কাছে বিক্রি করে পরিবারের মুখে তুলে দেন খাবার। এ যেন পাথরে ঘুরছে জীবনের চাকা। এ চিত্র দেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ার। প্রায় দেড়লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিশ হাজারের বেশি পাথর শ্রমিক। এ পাথর উত্তোলিত হচ্ছে নদী ও সমতল ভূমি হতে।

দু’সীমান্তের বুক চিরে প্রবাহিত মহানন্দা নদী ত্রিশ হাজার শ্রমিকের জীবিকার বিশাল ভান্ডার। ভাগ্যদেবতাও মনে করে মহানন্দাকে। প্রতিদিন শতশত টন নুড়ি পাথর উত্তোলন হচ্ছে এ নদী থেকে। শ্রমিকরা দলবেঁধে বাতাসে ফুলানো গাড়ির চাকার টিউব, লোহার চালনি, পাথর শনাক্তের জন্য লোহার রড নিয়ে, মহানন্দার বরফগলা পানিতে নেমে নুড়িপাথর উত্তোলন করছেন তারা। পরে পানিতে ভাসানো টিউবের ঢাকিতে করে উত্তোলনকৃত পাথর দুকাঁধে ভর করে তীরে এনে জমা করে। সন্ধ্যায় মহাজনের কাছে বিক্রিলব্ধ টাকায় জোটে তাদের পরিবারের আহার। দিনশেষে প্রতিদিন মজুরী হিসেবে মিলে ৪ থেকে ৫শ টাকা। আর উপার্জনের অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন শীতকে উপেক্ষা করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বরফগলা পানিতে নেমে নুড়ী পাথর কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে এগারটায় কথা হয় আমিনুর হোসেন, জাকির হোসেন ও ফরিদ হোসেনের সাথে। তারা জানান, সকাল ৯টায় নদীতে নেমেছেন। পানি খুব ঠান্ডা। কিছু করার নেই, বাইরে কাজ নেই। কথা হয় পাথর শ্রমিক বারঘরিয়া গ্রামের মধ্য বয়স্ক আব্দুল মালেকের সাথে, তিনি বলেন, ভাই নদী মহানন্দাই আল্লাহর রহমতে আমাগো বাঁচাই রাখছে। পরিবার দুই ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে দিয়েছি। পানি বরফের মতো ঠান্ডা। কাজ না করলে খাওয়ামু কী। কথা হয় জাকির নামের আরেক শ্রমিকের সাথে। ঘরে স্ত্রীসহ চার ছেলে-মেয়ে। সন্তানের ভরণ-পোষন চলে এই পাথর জীবিকার উপর। দিনভর দলের সাথে বরফগলা ঠান্ডা পানিতে পাথর তুলে পারিশ্রমিক নিয়ে পরিবারের অন্ন বস্ত্র শিক্ষাসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করেন। এতো ঠান্ডা পানিতে কাজ করছেন, পরে অসুখ ধরে না প্রশ্ন করলে রহিম নামের আরেক শ্রমিক জানান, হ ভাই, সর্দি-জ্বর তো হয়। কিছু দিন জ্বরে ভুগলাম। কাজ না করে তো উপায় নাই। অনেক সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)এর বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। কখনো কখনো বন্ধ হয়ে যায় পাথর উত্তোলনের কাজ। এতে কমে যায় রুজি-রোজগার। তবুও প্রাত্যহিক ঝুঁিক নিয়েই পাথর তুলতে নেমে যায় নদীর বরফগলা জলে।

webnewsdesign.com

নদী মহানন্দার পাথর শ্রমিক ছাড়াও এ নদীর তীরে পাথর নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিং এর কাজ করছে শতশত নারী পাথর শ্রমিক। তেঁতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর পর্যন্ত ১৫-১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর তীরসহ সড়কের উভয় পার্শ্বে চলে পাথর লোড-আনলোড, নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিংয়ের কাজ। এসব কাজে জড়িত শতশত নারী-পুরুষ পাথর শ্রমিক। তারাও ভোর সকালে ঘরের গৃহস্থালি কাজ সেরে হিম-কুয়াশার ভিতরেই ঘর হতে বের হয়ে যায় কাজের উদ্দেশে। ভোর সকালে যখন কুয়াশা ঢাকা চারপাশ, কনকনে শীতে হাত অবশ হয়ে আসে। কিন্তু সেই অবশ করা ঠান্ডাও হার মানে এসব কর্মজীবি বীর শ্রমিকদের কাছে। অটোভ্যান ও অটোরিক্সা ও কেউ সাইকেল চালিয়ে যোগ দেয় কাজে। সকাল থেকে সন্ধ্যা। দিনশেষে এসব শ্রমিকরা মহাজনের কাছ হতে টাকা নিয়ে বাজার করে ঘরে ফিরে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটাতে।

কথা হয় ক্র্যাশিং মেশিনে পাথর ভাঙা কাজে নিয়োজিত জরিনা খাতুনের সাথে। তিনি জানান, ফজরের আযান শুনে ঘুম থেকে উঠতে হয়। তারপর তাড়াহুড়ো করে নিজের ও দুই সন্তানের জন্য রান্না করতে হয়। সন্তানদের কোনো দিন খাইয়ে কোনো দিন না খাইয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় তাকে। দেরি করে কাজে পৌঁছালে মহাজনের গালি শুনতে হয়। কোনো কোনো দিন দেরি করার কারণে কাজে নেওয়া হয় না। চোখের পানি ফেলে মাগুড়া গ্রামের শেফালি আক্তার, ‘কয়েক বছর ছয়েক আগে স্বামী ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করেছে। ঘরে দুই মেয়ে। ওদের তো বড় করতে হবে, লেখাপড়া ও বিয়ে দিতে হবে। তাই শীতকে শীত মনে না করে পাথরভাঙ্গা মেশিনে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। এরকম শতশত আমেনা, রহিমা, জরিনার মতো নারী কাজ করছে জীবিকা ও সংসারের তাগিদে। এদের সাথে নানা বয়সী পুরুষ শ্রমিকরাও। সমতালে সম্প্রীতির বন্ধনে শীতকে তুচ্ছ মনে করে কাজ করে যাচ্ছে জীবনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। জীবনযুদ্ধে এসব অসহায় মানুষগুলো ঝুঁকি নিয়ে দিনভর যুদ্ধ করে স্বপ্ন দেখে সুন্দর আগামীর।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

দৈনিক প্রথম দৃষ্টি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
প্রকাশক
মাসুদ করিম সিদ্দিকী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মিজানুর রহমান সিদ্দিকী রঞ্জু
সম্পাদক
এস কে দোয়েল
প্রধান প্রতিবেদক
আব্দুল্লাহ আল মাহাদী
অফিস ব্যবস্থাপনা
নিসা আলী
সম্পাদকীয় কার্যালয়
৫/সি, আফতাবনগর মেইন রোড, রামপুরা, ঢাকা।
আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয়
চৌরাস্তা বাজার, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়
ফোন
+৮৮০১৭৫০-১৪০৯১৯ (সম্পাদক)
+৮৮০১৭১৮-৭৭২৭৪৯ (বার্তা-সম্পাদক)
Email
prothomdristy@gmail.com